জাতীয়বিশ্ব বার্তা

এ যেন বইয়ে পড়া এক গল্প, ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করে গ্রামে বিনামূল্যে সেবা দিচ্ছেন ডা. শাহীন

এ যেন বইয়ে পড়া এক গল্প, ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করে গ্রামে বিনামূল্যে সেবা দিচ্ছেন ডা. শাহীন

 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর অনেকেই যেখানে শহুরে জীবন কিংবা বিদেশমুখী ক্যারিয়ারের স্বপ্নে বিভোর হন, সেখানে ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রূপসদী গ্রামোর ডা. শাহিন আহমেদ।

 

ব্যক্তিগত সাফল্য ও আর্থিক সমৃদ্ধির সহজ পথ ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছেন গ্রামের সাধারণ মানুষের সেবা করার পথ।

 

নিজ গ্রামে ফিরে এসে তিনি নামমাত্র ভিজিটে রোগী দেখছেন—মাত্র ২০০ টাকায় চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং অসহায়দের জন্য রাখছেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবা।

 

সপ্তাহে নির্দিষ্ট দুই দিন তিনি গ্রামের মানুষের জন্য সময় বরাদ্দ রাখেন।

 

প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও মঙ্গলবার সকাল ১০:০০- দুপুর ২:০০ টা পর্যন্ত আল মদিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বাঞ্চারামপুর সদরে বসে রোগী দেখেন তিনি।

 

এছাড়াও প্রতি সোম ও মঙ্গলবার বিকেল ৪টা হতে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং বুধবার সকাল-সন্ধ্যা ব্রাদার্স মেডিসিন কর্নার,রূপসদী উত্তর বাজারে বসেন ডা. শাহীন।

 

এতিম,আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল,স্কুল-মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা ও বন্ধু মহলের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন তিনি।

 

শাহীন রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০১২ সালের শিক্ষার্থী। এরপর বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন ঢাকার সরকারি বিজ্ঞান কলেজে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সারা দেশে মেধা তালিকায় ১০০ এর মধ্যে অবস্থান করে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পান। ঢাকা মেডিকেল থেকেও যথাসময়ে কৃতিত্বের সাথে পাস করে নামের সাথে ডা. পদবী যোগ করেন তিনি।

 

শহরে থাকলে যেখানে কয়েকগুণ বেশি আয় করা সম্ভব ছিল, সেখানে তিনি মানবিক দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

 

স্থানীয়দের মতে, ডা. শাহিন শুধু একজন চিকিৎসক নন, বরং গ্রামের মানুষের কাছে তিনি এক নির্ভরতার প্রতীক। বৃদ্ধদের দীর্ঘদিনের অসুখ, শিশুদের সর্দি-কাশি কিংবা জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যায় তিনি হয়ে উঠেছেন প্রথম ভরসা। তার সহজ-সরল আচরণ এবং আন্তরিকতা মানুষের মন জয় করেছে।

 

শাহীনের স্কুল শিক্ষক আব্দুল হালিম বলেন, শাহীন আমাদের সবার গর্ব। তাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সে সমাজের সেবায় মনোনিবেশ করেছে, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এর চাইতে বড় ব্যাপার আর কী হতে পারে, এটি সমাজের জন্য এক দৃষ্টান্ত।

 

স্থানীয় বাসিন্দা ও স্পেন প্রবাসী কামরুল হাসান বলেন, শাহীন আমাদের গ্রামের সব ডাক্তারদের জন্য অনুকরণীয় হতে। সবাই যদি এভাবে ভাবতো তাহলে স্বাস্থ্য সেবায় আমরা পিছিয়ে থাকতাম না।

 

সহপাঠী ও পরিচিতদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন চটপটে ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা কখনো তার ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলেনি। সেই তরুণ আজ নিজের কর্মের মাধ্যমে সমাজে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।

 

বর্তমান সময়ে যখন অনেক শিক্ষিত পেশাজীবীর মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা ও অহংকারের প্রবণতা দেখা যায়, তখন ডা. শাহিন আহমেদের মতো মানুষরা ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়ান। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম নয়, বরং সমাজকে বদলে দেওয়ার শক্তিশালী হাতিয়ার।

 

ডা. শাহীন বলেন, আমি সব সময় মানুষের সেবা করে যেতে চাই। টাকা পয়সা বড় কিছু না, মানুষের পাশে থাকাটাই জীবনের বড় কৃতিত্ব। সবার ভালোবাসা পাচ্ছি, এই ভালোবাসার মূল্য তো আমাকে পরিশোধ করতে হবে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং তরুণ চিকিৎসকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। ডা. শাহিনের এই মানবিক দৃষ্টান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সমাজমুখী হওয়ার বার্তা দেয়।গ্রামের মানুষের প্রত্যাশা—তিনি যেন আজীবন তাদের পাশে থাকেন এবং অন্তত মাসে একটি দিন হলেও এই সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। এমন উদ্যোগই এক সময় একজন মানুষকে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে দিতে পারে।

Related Articles

Back to top button