নিভৃত এক পল্লীর চর থেকে কণ্ঠস্বর হয়ে সংসদে গেলেন শহীদ নয়ন, হাহাকারের বদলে হাসি

সময়ের বাঞ্ছারামপুর ডেস্ক:
বাঞ্ছারামপুরের নিভৃত এক চর থেকে যেন সংসদে গেলেন শহীদ নয়ন। স্বশরীরে নয় বরং প্রতিবাদ ও চেতনার এক কণ্ঠস্বর হয়ে। জাতীয় সংসদে যখন তার নাম উচ্চারিত হচ্ছিল তখন যেন বিএনপির সংসদীয় সব সদস্যের চোখে মুখে এক ভার, আর বুকে ছিল অবিরাম এক ভালোবাসার স্রোত। তারেক রহমানও দিয়েছিলেন মনোযোগ, তার কানে পৌঁছে নিভৃত এক পল্লীর বালকের কথা, যে কি না জীবন দিয়েছিল দেশ আর গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য।
গত ১২ই মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বেশ জোড়ালো কণ্ঠে ছাত্রদলের শহীদ নয়নের নাম উচ্চারণ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। দলের জন্য যে যুবক দিয়েছিল প্রাণ তাকে স্মরণে না রাখলে আর হয় কি করে। জোনায়েদ সাকি উচ্চারণ করছিলেন নয়ন শব্দটি তখন যেন বাঞ্ছারামপুরের বিএনপি নেতাকর্মীদের হৃদয়ের গভীরে বয়ে যায় এক স্মৃতি আর ভালোবাসার বহমান ধারা। সংসদে নয়নের নাম যাবে এমনটিই যেন চেয়েছিলেন তারা।
উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী সময়ের বাঞ্ছারামপুরকে জানান, শহীদ নয়নের নাম উচ্চারিত হওয়াতে তারা আপ্লুত। এমনটিই চেয়েছিলেন। এতে করে শহীদ নয়নের পিতা মো. রহমত উল্লাহ ও মাতা তাসলিমা বেগমের আত্মায় মিলেছে প্রশান্তি, চোখ বেয়ে পড়েছে আনন্দ অশ্রু। যে সোনার মানিককে হারিয়ে ছিলেন হাহাকারে, তা যেন আজ হয়ে উঠেছে গর্বের রেখাপাত। এমন ছেলের জন্য তো গর্ব করাই যায়, যে কি না দিতে জানে প্রাণ মানুষের তরে।
মূলভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক চর চরশিবপুরে নয়নের বেড়ে উঠা। কে জানতো সেখান থেকেই এক প্রতিবাদের দ্বীপ জ্বালিয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় আসবেন তিনি। হয়ে থাকবেন জাতীয়তাবাদীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। রাজনীতি যেন এমনই! এক সময় যে থাকে নিভৃতে, যাকে মেরে ফেললেও কিছু যায় আসে না, সময়ের স্রোতে তিনি হয়ে উঠেন অনুপ্রেরণার এক বাতিঘর, মুখে মুখে ফেরা মানুষের গানে পাওয়া যায় তাকে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের সোনারামপুর ইউনিয়নে মেঘনার পাড়ে চরশিবপুর নামক গ্রামে মো. রহমত উল্লাহ ও তাসলিমা বেগমের কুঁড়েঘরে চাঁদের আলো আসে, জন্ম হয় একটি সোনামুখের, কী টানা টানা চোখ, কচি কচি মুখ, খাড়া উঁচু নাক, তুলতুলে গাল আর সোনালী কপাল! মায়াবী ফুটফুটে চেহারা! মা বাবা বড় শখ করে চুমু দিয়ে তার নাম রাখে “নয়ন”। সেদিন ছিল ২ এপ্রিল ১৯৯৪ সালের পূর্ণিমা রাত।
১৯ নভেম্বর ২০২২ সালে স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়ে শহীদ হন নয়ন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার আন্দোলনে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিতব্য মহাসমাবেশ উপলক্ষে বিএনপি নেতা কৃষিবিদ ড. ইঞ্জিনিয়ার মোঃ সাইদুজ্জামান কামালের নেতৃত্বে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা সদরে লিফলেট বিতরণে যোগ দিয়েছিল নয়ন। অনুমান দুপুর ৩ টা থেকে ৪ টার দিকে লিফলেট বিতরণকালে থানা টু মোল্লা বাড়ি ব্রীজের পশ্চিম পাশে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংগীয় ফোর্সসহ বাঁধা দেয়। ওসির সাথে কামালের সাধারণ যুক্তি তর্ক চলা অবস্থায় একজন পুলিশ সদস্য নয়নের পেটে গুলি চালায় বলে দাবি বিএনপি নেতাকর্মীদের। মূহুর্তেই তরতাজা যুবক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঈমান আলী, আওলাদ, জামাল সহ অন্যান্যরা আহত নয়নকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গুরুতর জখম থাকায় ঢাকা মেডিকেলে রেফার করে। আর ফিরেননি নয়ন। তবে তবে ফিরেছেন পুরো উপজেলার জন্য এক আদর্শ হয়ে।